Skip to main content

বাংলার বারুজীবী বৃত্তান্ত

একসময় পান সুপারি দিয়ে নেমন্তন্ন করার প্রথা ছিল গ্রাম বাংলায়। তারপর ভোজের শেষে মুখুশুদ্ধি হিসেবেও পানের ব্যবহার ছিল তখন ।পান রাঙ্গা ঠোঁট ছিল আজকের সুন্দরীদের লিপস্টিক এর বিকল্প। আর এই পানের চাষ ও বিক্রির সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের বলা হতো বারুজীবি বা বারুই। পশ্চিমবঙ্গে হাওড়া ,হুগলি ও বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে রয়েছে বারুইপাড়া ।এছাড়া দুই মেদনীপুর সহ অন্যান্য জেলাতেও কমবেশি এই সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। একেবারে নিরীহ শান্ত সৌম্য ভীতু প্রকৃতির সম্প্রদায় ।তবে শৈল্পিক চিন্তাধারা বিশেষভাবে ফুটে ওঠে এই সম্প্রদায়ের।

উৎপত্তি - বারুজিবী জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে একটি প্রচলিত লোককথা রয়েছে ।সেখানে বলা হয়েছে এক শিব ভক্ত ব্রাহ্মণ ছিলেন ।তিনি প্রতিদিন শিব পূজা করতেন। কিন্তু, তার আরো অনেক কাজ ছিল ।যেমন যেমন পান চাষ, কাপড়বোনা প্রভৃতি।ব্রাহ্মণের বেশিরভাগ সময় চলে যেত ওই কাজে।তারপর কোন এক সময় পেলে শিবের মাথায় দুই একটি ফুল ছুঁড়ে কর্তব্য সারতেন। এসব দেখে শিব ঠাকুর তাকে আন্তরিকভাবে শুধুমাত্র তার পূজা করতে বললেন। এবং আরো জানিয়ে দিলেন তা করলে তার কোন অভাব থাকবে না। কিন্তু, ব্রাহ্মণ সে কথা শুনলেন না। পান চাষ নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পরলেন। এবার শিব ঠাকুর রেগে গিয়ে তাকে বারুজিবি হয়েই পান চাষের ব্যবসা করার অভিশাপ দিলেন। তৈরি হলো পান চাষী বা বারুজিবিসম্প্রদায় ।আর এই অনামী ব্রাহ্মণ হলেন বারু জীবীদের আদি পিতা। বারুজীবীদের কুলোদেবী সিংহবাহিনী মা সৌম্য চন্ডী বা সমীচণ্ডী। বৈশাখ মাসের শুক্ল পঞ্চমীতে অথবা অঘ্রাণ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তে পানের বরজ এ দেবী সিংহ বাহিনীর পূজো হয়। বিশ্বাস করা হয় পানের বরজে স্বয়ং মা চন্ডী বাস করেন ।তাই, অত্যন্ত শুদ্ধভাবে ঢুকতে হয় । সামাজিকভাবে শুভ কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোতে পান একটি অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে আজও সমান জনপ্রিয়। তার নিয়ে একটি ছড়ার কথা মনে পরে । আগডোম বাঘডোম ঘোরাডোম সাজে ,ঢাক ঢোল ঘাগর বাজে ,বাজত, বাজতে চলল ঢুলি। ঢুলি গেল সেই কমলাপুলি ।আয় রঙ্গ হাটে যাই গোয়া পান কিনে খাই। গোয়া পান মানে খয়ের দিয়ে সাজানো পান যা চিবিয়ে খেলে সুন্দরীদের ঠোঁট লাল হতো ।আবার পানের সঙ্গে চুনের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয়েছে চলতি প্রবাদ যেমন পানের সঙ্গে চুন যেমন প্রেম তেমন কম হলে লাগে ঝাল ।বেশি হলে পোরে গাল।এভাবেই বাংলার সংস্কৃতিতে বেঁচে আছে পান ও তার সঙ্গে পান চাষী বারুজীবি সম্প্রদায়।

( ✍️ শান্তি রীত )



Popular posts from this blog

স্বাধীনতার নায়করা পর্ব ~ ১৫

ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক কে চেনেন..? বিগত একযুগ ধরে রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত রাস্তাটির নাম আজ আর নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হবেনা..? হরিশ মুখার্জী স্ট্রিট এর কথা বলছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যার নামে এই রাস্তা তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ লোকজনই মাথা চুলকাবেন। ঐ এলাকার যারা বাসিন্দা, তারাও কি সবাই জানেন.... ? ১৮২৪ সালে জন্ম মানুষটির, পুরো নাম হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ভবানীপুর তখন একেবারেই গণ্ডগ্রাম। সাত বছরের হরিশ রেভারেন্ড পিফার্ডের বদান্যতায় ভবানীপুরের ইউনিয়ন স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। একদিন এক ইংরেজ শিক্ষক ভারতীয় ছেলেদের 'ব্লাডি ইন্ডিয়ান নিগার' বলে গালিগালাজ করায় স্কুল চত্বরেই হরিশ তাঁকে বেদম ঠ্যাঙান। মাত্র পনেরো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বেরোতে হয় হরিশকে, কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরেও কোনও চাকরি জোটে না। শেষমেশ ‘টলা অ্যান্ড কোম্পানি'-র কলুটোলার অফিসে নেটিভ রাইটারের চাকরি পান। সেখানে গিয়ে দেখলেন, শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে নেটিভদের বেতনে বিরাট ফারাক। দেশীয় লোকেরা প্রাপ্য মর্যাদাও পায় না। অফিসে উন্নতির পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তাঁর প্রতিবাদী স্বভাব। নে...

ইসলামিক শাসনপ্রণালি

 মুসলমানরা যেখানে বাস করে সেটাই মুসলমান রাষ্ট্র, সেটা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তই হোক না কেনো। যতই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ অঞ্চলই হোক না কেনো মুসলমানরা বাস করে এর অর্থ সেটা মুসলমান রাষ্ট্র।  কারণ একটি মুসলমান এলাকার সমাজ ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা, বিচার ব্যবস্থা, ব্যবসা, খাজনা বা কর আদায় (Tax collection), নিয়ম (আইন) তৈরী, নিয়ম লাগু করা, সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি প্রতিবেশী অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক সমস্ত কিছুই তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। এতে কোন ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক দলের সরকার আছে তা বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে না। মুসলমান যে এলাকায় বাস করে সেটাই মুসলমান রাষ্ট্র, সেটা 20 জন হোক বা 20 কোটি।  অমিতাভ বচ্চনের কথায়- " हम जहां खड़े होते हैं लाइन वहां से शुरू होती है"

Déjà Rêve: স্বপ্ন যখন বাস্তব

 Déjà Rêve: স্বপ্ন যখন বাস্তব ↓ স্বপ্ন আমাদের মস্তিষ্কের সৃষ্ট কিছু চিত্র বা গল্প যা আমরা ঘুমের ভিতর মনের অবচেতনে দেখি। ঘুমের যেকোন পর্যায়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি। তবে সাধারণত ঘুমের REM (rapid eye movement) পর্যায়ে আমরা বেশি স্বপ্ন দেখি কারণ তখন আমাদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সচল থাকে। "দেজা রেভে" হল আপনি যা আগে কখনো স্বপ্ন দেখেছেন তা পুনরায় বাস্তবে দেখা। এর মানে, আপনি বর্তমানে যা চোখের সামনে দেখছেন তা একটি স্মৃতি এবং আপনি আগে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটার অনুরূপ কিছু বাস্তুবে দেখাকে দেজা রেভে বলে। অনেকেই মনে করেন যে দেজা রেভে হলো দেজা ভ্যূ এর বিপরীত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেজা রেভে হলো লুসিড ড্রিমিং এর বিপরীত এবং দেজা ভ্যূ এর অনুরূপ। ২০১৮ সালে ব্রেইন স্টিমুলেশন গবেষকরা বলেন যে দেজা রেভে সাধারণত আশেপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা না বুঝার জন্য হতে পারে। ফরাসি দলটি দেজা রেভে এর উপর স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য আরো পরীক্ষানিরীক্ষা করতে থাকেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে তারা দেখতে পান যে ১৯৫৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেজা রেভে হওয়া সবাই আংশিকভাবে মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলো। সাধারণত মৃগী রোগীদের চিকিৎসায় ইলেকট্রিক ব্র...