Skip to main content

স্বাধীনতার নায়করা পর্ব ~ ১৫

ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক কে চেনেন..?


বিগত একযুগ ধরে রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত রাস্তাটির নাম আজ আর নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হবেনা..? হরিশ মুখার্জী স্ট্রিট এর কথা বলছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যার নামে এই রাস্তা তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ লোকজনই মাথা চুলকাবেন। ঐ এলাকার যারা বাসিন্দা, তারাও কি সবাই জানেন.... ?


১৮২৪ সালে জন্ম মানুষটির, পুরো নাম হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ভবানীপুর তখন একেবারেই গণ্ডগ্রাম। সাত বছরের হরিশ রেভারেন্ড পিফার্ডের বদান্যতায় ভবানীপুরের ইউনিয়ন স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। একদিন এক ইংরেজ শিক্ষক ভারতীয় ছেলেদের 'ব্লাডি ইন্ডিয়ান নিগার' বলে গালিগালাজ করায় স্কুল চত্বরেই হরিশ তাঁকে বেদম ঠ্যাঙান। মাত্র পনেরো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বেরোতে হয় হরিশকে, কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরেও কোনও চাকরি জোটে না। শেষমেশ ‘টলা অ্যান্ড কোম্পানি'-র কলুটোলার অফিসে নেটিভ রাইটারের চাকরি পান। সেখানে গিয়ে দেখলেন, শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে নেটিভদের বেতনে বিরাট ফারাক। দেশীয় লোকেরা প্রাপ্য মর্যাদাও পায় না। অফিসে উন্নতির পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তাঁর প্রতিবাদী স্বভাব। নেটিভ কর্মচারীদের হয়ে মাইনে বাড়ানোর আর্জি নিয়ে গেলেন এবং অপমানের জবাবে মুখের ওপরে দিয়ে এলেন ইস্তফা।


মাসখানেকের মধ্যেই পেয়ে গেলেন নতুন চাকরি, মিলিটারি অডিটর জেনারেলের অফিসে। এখানকার আরেক কেরানী গিরীশচন্দ্র ঘোষ খুব বন্ধু হয়ে গেলেন হরিশের। ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাতায়াতের ফলে সেখানকার লাইব্রেরিয়ান প্যারীচাঁদ মিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপ হল তাঁর। ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস তন্নতন্ন করে পড়লেন তিনি। শ্বেতাঙ্গদের ভাগ্যান্বেষণে এ দেশে এসে আখের গুছিয়ে নেওয়া এবং এ দেশের মানুষের হ্যাংলামি, দুটোই কষ্ট দিতো হরিশকে। গিরীশের মুখ থেকেই একদিন জানতে পারেন, নতুন এক সংবাদপত্র আসতে চলেছে নাম 'হিন্দু পেট্রিয়ট'। এতদিনে সাহেবদের 'ইংলিশম্যান' কাগজের যোগ্য জবাব দেওয়া যাবে।


'হিন্দু পেট্রিয়ট' কাগজে লিখতে শুরু করলেন হরিশ। তাঁর কলম হয়ে উঠল চাবুক। ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিলেন তিনি। তিন মাসের মধ্যেই পত্রিকাটি সম্পাদনা করার দায়িত্ব পড়ল তাঁর উপর। পত্রিকা টিকে বাঁচাতে মালিকের অনুরোধে একসময়ে তিনি তার স্বত্ব কিনে নিতে বাধ্য হলেন। আর এতেই তিনি জড়িয়ে পড়লেন ভয়ঙ্কর এক ঋণের জালে।


ততদিনে গোটা বাংলা জেনে গেছে, ঝড়জল ভূমিকম্প যা-ই হোক না কেন, প্রতি বৃহস্পতিবার ‘হিন্দু পেট্রিয়ট' বেরোবেই। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশের লোকের নির্লজ্জ তোষামোদ আর আত্মসমর্পণের সুযোগেই ব্যবসা করতে এসে এত বড় দেশের কর্তৃত্ব পেয়ে বসেছে কোম্পানি। আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে শুধু সমাজের নিচু স্তরের মানুষ। একের পর এক আছড়ে পড়েছে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তাঁতি বিদ্রোহ, রেশম চাষিদের বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ । অন্যদিকে এডুকেটেড বাবুরা, দেওয়ান আর বেনিয়ারা ব্রিটিশের সঙ্গে বখরায় কারবার করে দেঁতো হাসি আর হিসেবি স্বার্থবুদ্ধি দিয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছেন। সিপাহি বিদ্রোহকে দি গ্রেট ইন্ডিয়ান রিভোল্ট' আখ্যা দিয়ে প্রথম শাসকের কুনজরে আসলেন তিনি।


বিদ্রোহের করুণ পরিণতির পর হরিশ বিশে ডাকাতের কাহিনি জানতে পারেন। নৃশংস এক নীলকর স্যামুয়েল ফ্রেডির সাথে লড়াই করতে গিয়ে বিশের ফাঁসি হয়েছিল। অথচ বিশ্বনাথ সর্দার সঙ্গীদের কাছে ছিলেন 'সাক্ষাৎ মহাপুরুষ', গরিব মানুষের ত্রাতা এবং অত্যাচারীর যম। তীব্র শ্লেষে হরিশের মনে হয়, 'ইংরেজের চোখে শেরউড জঙ্গলের রবিন হুড এক আদর্শ প্রবাদপুরুষ, কিন্তু নদীয়ার বামনীতলার জঙ্গলের বিশ্বনাথ সর্দার এক ঘৃণ্য ডাকাত! ' একে একে অনেক তথ্যই জানতে পারলেন হরিশ। ক্যারেল ব্লুমই বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম ইংরেজ নীলকর। জানলেন, বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানির দোর্দণ্ডপ্রতাপ ম্যানেজার লারমুর সাহেবের কথা |


চাষিরা এই নীলকর প্রভুদের নিঃশর্ত দাসে পরিণত হয়েছে। দাদন যে এক বার নেবে, নীলচাষ তাকে করতেই হবে। না করলে কারাদণ্ড অনিবার্য। নীলকরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ? আইন নেই যে! মফস্বলের আদালতে শ্বেতাঙ্গদের নামে মামলা ঠোকা যায় না। বাংলার গ্রামে গ্রামে তখন চাষির ঘরে আগুন জ্বলছে, তার চোখের সামনে বৌ-মেয়েদের বিবস্ত্রা করে চাবুক মারা হচ্ছে, তার পর কুঠিতে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের চূড়ান্ত সম্ভ্রমহানি করা হচ্ছে।


বাংলার গ্রাম তখন কাঁপিয়ে দিচ্ছেন দুই ভাই — বিষ্ণুচরণ আর দিগম্বর বিশ্বাস। নদীয়ার চৌগাছা গ্রামে নীলকুঠির হাজার হাজার লেঠেল এক গভীর রাতে কী ভাবে অত্যাচার চালায়, তার বিশদ বিবরণ লিখলেন পত্রিকায়। প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদদাতা হিসেবে হিন্দু পেট্রিয়ট-এর প্রথম প্রতিনিধি হন কুমারখালির হরিনাথ মজুমদার, যিনি 'কাঙাল হরিনাথ' নামেই সমধিক পরিচিত। সেই সময় চাষিরা কত প্রতিকূলতা সহ্য করে বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন, নীলকর, ব্রিটিশ প্রশাসন এবং সংবাদপত্র কী ভূমিকা নিয়েছিল, এ সবেরই বিশদ বিবরণ দিয়েছেন হরিশ। তাঁর মনে হয়, 'বাংলাদেশের ইতিহাসে এ এক অসাধারণ ঘটনা'। বার বার নীল কমিশন বসানোর দাবি জানান তিনি।


হরিশচন্দ্র তাঁর অগ্নিগর্ভ ভাষায় লেখেন, "নীল আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার পর থেকে এই বাংলাদেশের রায়তেরা যে অসামান্য নৈতিক শক্তির স্পষ্ট পরিচয় দিয়েছে, এখন পর্যন্ত তা পৃথিবীর আর কোনো দেশের কৃষকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এইসব দরিদ্র কৃষকদের রাজনৈতিক জ্ঞান এবং ক্ষমতা নেই। সরকার, সংবাদপত্রগুলি, আইন-আদালত সমস্তই তাদের বিরুদ্ধে। তা সত্ত্বেও প্রায় নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় এই নিঃস্ব কৃষকসমাজ এমন একটা বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ হয়েছে, যা গুরুত্ব এবং মহত্ত্বে পৃথিবীর যে কোনো দেশের উল্লেখযোগ্য সামাজিক বিপ্লবের তুলনায় কোনোক্রমেই নিকৃষ্ট নয়।" অথচ তখনকার এই জীবন-মরণ সংগ্রামের কোনও প্রভাবই পড়েনি কলকাতার বুকে। যখন-তখন গাঁয়ের চাষিরা তাঁর বাড়িতে এসে আছড়ে পড়ে, তাদের জন্য টাকার সংস্থান রাখতে হয়। শুধু কলম দিয়েই নয়, নিজের যথাসর্বস্ব সংস্থান দিয়েও তিনি আমৃত্যু সাধ্যমতো নীলবিদ্রোহের রসদ জুগিয়েছিলেন।


সাঁইত্রিশ বছরের হরিশের শেষ দিনগুলো কাটে ঔপনিবেশিক শাসক আর যক্ষ্মা রোগের সঙ্গে লড়াই করে। হরিশ শয্যাশায়ী, এ দিকে নদিয়া যশোর পাবনা রাজশাহী ফরিদপুরের লাখ লাখ চাষি আগ্রহে অধীর, কবে তারা তাঁকে এক বার চোখের দেখা দেখবে! নীলচাষিদের সম্মিলিত শক্তি শেষ অবধি অসাধ্যসাধন করে। এরমধ্যে একদিন যুবক দীনবন্ধু মিত্র 'নীলদর্পণ' নিয়ে দেখা করতে আসেন হরিশের সঙ্গে। আর এক দিন এলেন রেভারেন্ড জেমস লং, নীল আন্দোলনের আর এক পুরোধা।


অবশেষে ১৮৬১ সালের ১৬ই জুন নিভে গেলো 'ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক'-এর জীবন প্রদীপ। কালীপ্রসন্ন সিংহ শেষ দেখা করতে এসে বললেন, “লক্ষ লক্ষ গরীব নীলচাষী এবার পিতৃহীন হলো...!"

হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়

জয়হিন্দ| বন্দেমাতরম|


কলমে - স্বপন সেন

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা



এক যে ছিলো নেতা


#স্বাধীনতার_নায়করা #azaadikaamritmahotsav #77thindependenceday #india #harghartiranga #Har_Ghar_Netaji #স্বাধীনতা #বাংলা #বিপ্লবী


* Facebook এর পাশাপাশি আমরা পথচলা শুরু করেছি YouTube এও আমাদের কাজ ভালো লাগলে আমাদের channel টি Subscribe করে পাশে থাকবেন.. এই রইলো link 4 https: //appopener.com/yt/192gtpoem

Popular posts from this blog

মুসলমানদের Business Policy

হিন্দুদের উপর শাসন করার Process একটাই, ১৷ ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিক শোষণ, হিন্দুদের ক্ষমতাকে ধ্বংস করা। ২| স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য লাভ ৩| সাহায্য করার নামে স্থানীয় প্রশাসন দখল ও একচ্ছত্ররাজ। -- এই একই পথ অনুসরণ করা হয়। সে ইংরেজ শাসন হোক মুসলমান শাসন। এখন, আমাদের প্রথম কাজ আর্থিক শোষণ কে প্রতিহত করা, আর্থিক শোষণ প্রতিহত করতে না পারলে আমরা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই সব ক্ষমতাচ্যুত হব। আর, ক্ষমতাচ্যুত মানুষের মেরুদণ্ডকে গুঁড়িয়ে দিতে বেশি সময় লাগে না... পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক শোষণের (Economic_Jihad) চরমতম সীমায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে মুসলমান যুবকেরা ব্যাপকভাবে কব্জা করেছে, প্রচুর মুসলমান নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। আমরা যদি আর্থিক শোষণকে প্রতিহত করতে না পারি তাহলে সমূহ বিপদ... Muslim_Economy এর পাতা কুড়োনো থেকে KTM চালানোর সফরটা বেশ দেখার মতো। কিন্তু, কিভাবে হলো?🤔 আমাদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান বাচ্চাদেরকে পাতা কুড়োতে, প্লাস্টিক কুড়োতে দেখেছেন... তার আগের প্রজন্ম দেখেছে দিন অনা, দিন খাওয়া, একবেলা উপর... আমাদের এই এক প্রজন্মের মধ্যেই একটা সম্প্রদায় এত...