Skip to main content

গান্ধীজীর ভণ্ডামি

আমি ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় থেকে শুনে আসছি যে মহাত্মা গান্ধীজী একজন ব্যারিস্টার ছিলেন। তখন থেকেই ভাবতাম যে উনি নিশ্চয়ই অনেক শিক্ষিত, অনেক জ্ঞানী। পরে জানতে পারলাম যে গান্ধীজী তাঁর সারাজীবনে একটিই মাত্র শিক্ষাগত সার্টিফিকেট অর্জন করতে পেরেছিলেন, তা হল ম্যাট্রিক পাসের সার্টিফিকেট। ১৮৮৭ সালে গান্ধীজী টেনেটুনে কোনমতে থার্ড ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করেন, তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৬০০র মধ্যে ২৪৭! তখনকার দিনে ব্যারিস্টার হতে হলে কোন পরীক্ষাই দিতে হত না, কিছুদিন কোন বয়স্ক এবং অভিজ্ঞ ব্যারিস্টারের সহকারী হিসেবে কাজ করলেই ব্যারিস্টার হিসেবে বার এসোসিয়েশনের সদস্য হওয়া যেত। কিন্তু এই সহকারী হওয়ার জন্যও গান্ধীজীর ভারতীয় সার্টিফিকেট এবং তার
ফলাফল গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি, তাই জন্য গান্ধীজীকে আবার লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসতে হয়। প্রথম বার সেই পরীক্ষায় ফেল করার পর গান্ধীজী দ্বিতীয় বারে কোনমতে পরীক্ষায় পাশ করতে সক্ষম হন এবং একজন ব্যারিস্টারের সহকারী হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করেন। তখনকার যুগের অনেক মানুষেরই প্রথাগত শিক্ষা খুব বেশি থাকত না, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু তাঁরা ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। কিন্তু গান্ধীজীর আচরণে এটা স্পষ্ট হয় যে তাঁর মধ্যে সেই স্বশিক্ষা ছিল না।

গান্ধীজী হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ গীতা সম্পর্কে তাঁর 'অনাশক্তি যোগ' গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, "গীতার বর্ণিত যুদ্ধ কোন বাস্তব যুদ্ধ নয়, পরন্তু ভৌতিক যুদ্ধ বর্ণনার রূপকের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ নিরন্তর চলিতেছে, ইহাতে তাহাই বর্ণিত হইয়াছে। রসস্থিত যুদ্ধকে রসপূর্ণ আকার দেওয়া হইয়াছে।”

এর সহজ সরল অর্থ হল মহভারতের যুদ্ধ কোন বাস্তব ঘটনা নয়, মানুষের মনের শুভ অশুভ শক্তির মধ্যে যে অবিরাম যুদ্ধ চলছে তারই একটা রূপক মাত্র। গান্ধীজী তাঁর 'গীতাবোধ গ্রন্থের প্রস্তাবনায় বলেছেন,

“মহাভারতকে ঐতিহাসিক গ্রন্থ বলিয়া ধরা হয়, কিন্তু আমার কাছে মহাভারত ও রামায়ণ ঐতিহাসিক কোন গ্রন্থই নয়। ইহারা ধর্মগ্রন্থ। আর যদি ইতিহাস বল, তবে উহারা আত্মার ইতিহাস। হাজার হাজার বৎসর পূর্বে কী হইয়াছিল তাহার বর্ণনা উহাতে নাই, পরন্তু আজ প্রত্যেক মানুষের অন্তরে যাহা চলিতেছে, উহা তাহারই প্রতিচ্ছবি।”

হিন্দু ধর্মের প্রাণপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে গান্ধীজী বলেছেন, "গীতার কৃষ্ণ মূর্তিমস্ত শুদ্ধ পূর্ণজ্ঞান, কিন্তু কাল্পনিক। ইহাতে কৃষ্ণ নামক অবতার পুরুষকে অস্বীকার করা হইতেছে না ।
শুধুমাত্র বলা হইতেছে যে পূর্ণ কৃষ্ণ কাল্পনিক। পূর্ণ অবতারের কল্পনা পরে আরোপিত হইয়াছে।" এই হল হিন্দুধর্ম সম্পর্কে গান্ধীজীর জ্ঞান এবং ধারণা!

গান্ধীজী বলতেন, “একজন সত্যাগ্রহী সব সময় আক্রমণকারীর দ্বারা নিহত হবার কামনা করবে, কিন্তু কাউকে হত্যা করার কামনা করবে না।”

যেখানে পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্রতম প্রাণীও আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে টিঁকে থাকার চেষ্টা করে, সেখানে গান্ধীজীর এই নীতির ফলে ভারত ভাগের আগে ও পরে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ হিন্দুরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। গান্ধীজী তাকে প্রতিরোধ করার জন্য কোন পদক্ষেপ তো নেনই নি, বরং সকল হিন্দুদের মরতে উৎসাহ দিয়েছেন।

বসন্তের টিকা দেওয়াকে গান্ধীজী পাপ বলে মনে করতেন। এর মূল কারণ হল গান্ধীজী ছিলেন পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতির বিরোধী। কারণ তিনি ইনজেকশন দেওয়াকে ও অপারেশন করাকে হিংসা বলে মনে করতেন। ১৯৪৬ সালে গান্ধীজীর স্ত্রী কস্তুরবার ম্যালেরিয়া জ্বর হয়। ডাক্তার তাঁকে পেনিসিলিন ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই জন্য বৃটিশ সরকার তাঁর জন্য লণ্ডন থেকে পেনিসিলিন ইনজেকশন নিয়ে আসে। কিন্তু গান্ধীজী হিংসার নাম করে সেই ইনজেকশন প্রয়োগ করতে বাধা দিলেন। এর ফলে গান্ধীজীর স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। অথচ ১৯২২ সালে যখন কারাবাসের সময় গান্ধীজীর খুব আমাশা হয় এবং ডাক্তার তাঁকে নিয়মিত ইনজেকশন নিতে বলেন, তখন তিনি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর গান্ধীজীর এ্যাপেনডিসাইটিস হয়, গান্ধীজী তখন অপারেশনও করান। গান্ধীজী ছিলেন ভণ্ড!


গান্ধীজী মনে করতেন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ঘৃণা করে যে পাপ কাজ করে তার ফলেই নাকি ভূমিকম্প হয়। তিনি ছিলেন এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন! নেতাজী বলেছিলেন, “বৃটিশের নির্দেশে গান্ধীজী যখনই কোন আন্দোলন তুলে নিতেন, তখনই তিনি নিজের শয়তানীকে চাপা দেওয়ার জন্য বা দেশের মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য অনশন শুরু করতেন।” গান্ধীজীর সকল প্রকার অনশন ও কারাবাস ছিল বৃটিশদের পরিকল্পনার অংশ।


ড. আম্বেদকরের মতে, "গান্ধীজী ছিলেন শক্তের ভক্ত আর নরমের যম। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালে একবার গান্ধীজী হিন্দু, খ্রিষ্টান ও ইসলামের মধ্যে তুলনা করে একটি বক্তৃতা দেন, সেই বক্তব্যে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয় এবং ১৯০৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি কয়েকজন মুসলমান তাঁর ওপর হামলা করে এবং তাঁকে প্রচণ্ড প্রহার করে। এরপর থেকেই গান্ধীজী মুসলমানদের সর্বপ্রকার সমালোচনা করা বন্ধ করে দিলেন এবং তারপর থেকেই তিনি মুসলমানদের অত্যন্ত গর্হিত অপরাধকেও অপরাধ বলে মনে করতেন না।


🖊Dev Basu

Popular posts from this blog

স্বাধীনতার নায়করা পর্ব ~ ১৫

ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক কে চেনেন..? বিগত একযুগ ধরে রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত রাস্তাটির নাম আজ আর নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হবেনা..? হরিশ মুখার্জী স্ট্রিট এর কথা বলছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যার নামে এই রাস্তা তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ লোকজনই মাথা চুলকাবেন। ঐ এলাকার যারা বাসিন্দা, তারাও কি সবাই জানেন.... ? ১৮২৪ সালে জন্ম মানুষটির, পুরো নাম হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ভবানীপুর তখন একেবারেই গণ্ডগ্রাম। সাত বছরের হরিশ রেভারেন্ড পিফার্ডের বদান্যতায় ভবানীপুরের ইউনিয়ন স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। একদিন এক ইংরেজ শিক্ষক ভারতীয় ছেলেদের 'ব্লাডি ইন্ডিয়ান নিগার' বলে গালিগালাজ করায় স্কুল চত্বরেই হরিশ তাঁকে বেদম ঠ্যাঙান। মাত্র পনেরো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বেরোতে হয় হরিশকে, কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরেও কোনও চাকরি জোটে না। শেষমেশ ‘টলা অ্যান্ড কোম্পানি'-র কলুটোলার অফিসে নেটিভ রাইটারের চাকরি পান। সেখানে গিয়ে দেখলেন, শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে নেটিভদের বেতনে বিরাট ফারাক। দেশীয় লোকেরা প্রাপ্য মর্যাদাও পায় না। অফিসে উন্নতির পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তাঁর প্রতিবাদী স্বভাব। নে...

ইসলামিক শাসনপ্রণালি

 মুসলমানরা যেখানে বাস করে সেটাই মুসলমান রাষ্ট্র, সেটা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তই হোক না কেনো। যতই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ অঞ্চলই হোক না কেনো মুসলমানরা বাস করে এর অর্থ সেটা মুসলমান রাষ্ট্র।  কারণ একটি মুসলমান এলাকার সমাজ ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা, বিচার ব্যবস্থা, ব্যবসা, খাজনা বা কর আদায় (Tax collection), নিয়ম (আইন) তৈরী, নিয়ম লাগু করা, সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি প্রতিবেশী অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক সমস্ত কিছুই তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। এতে কোন ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক দলের সরকার আছে তা বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে না। মুসলমান যে এলাকায় বাস করে সেটাই মুসলমান রাষ্ট্র, সেটা 20 জন হোক বা 20 কোটি।  অমিতাভ বচ্চনের কথায়- " हम जहां खड़े होते हैं लाइन वहां से शुरू होती है"

ডিটেনশন ক্যাম্পের রাজনীতি ও বাঙালিদের আর্তনাদ

    Courtesy : Thakur Siddhant Kumar Bagchi 🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷🚷 আমরা অনেকেই আজকাল ডিটেনশন ক্যাম্প "Detention Camp", কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প  "Concentration Camp" অথবা  ইন্টার্ণমেন্ট ক্যাম্প "Internment Camp" এই শব্দগুলির সাথে কমবেশী পরিচিত। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ ডিকশনারী অনুযায়ী এই শব্দগুলির অর্থ হল, এমন একটি জায়গা যেখানে বন্দীদের সাময়িক সময়ের জন্য আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখা হয়, যতদিন না তাদের স্বপক্ষে বা বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।  ( A compound where prisoners are detained temporarily, as pending determination of their legal status under immigration laws.) বিশ্বের বুকে এই শব্দগুলি আদতে অতি কুখ্যাত শব্দ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। যেমন "কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প" শব্দটি শোনা মাত্র আমাদের মাথায় বিশ্বত্রাস এডল্ফ হিটলার ও তার গ্যাস চেম্বারে অসংখ্য বন্দীদের নৃশংস মৃত্যুর ভয়াবহতা ভেসে ওঠে। তবে ডিটেনশন হোক কিংবা কনসেন্ট্রেশন বা ইন্টার্ণমেন্ট ক্যাম্প, এই কুখ্যাত শব্দগুলি প্রথম শোনা গিয়েছিল 1482-1492 খৃষ্টাব্দ ...